হোয়াইট হাউস সোমবার জানিয়েছে, প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প ইউক্রেনের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সাহায্য সাময়িক ভাবে স্থগিত রাখার নির্দেশ দিয়েছেন।
“প্রেসিডেন্ট পরিষ্কার করে দিয়েছেন যে তিনি শান্তির দিকে মনোযোগ দিচ্ছেন,” প্রশাসনের একজন সিনিয়র কর্মকর্তা ভিওএ’কে বলেন। “এই লক্ষ্যে আমাদের অংশীদারদের অঙ্গীকারও আমাদের জন্য প্রয়োজন। আমরা আমাদের সাহায্যে সাময়িক বিরতি টেনে পর্যালোচনা করছি, যাতে এটা একটা সমাধানে অবদান রাখতে পারে।”
কর্মকর্তা নাম প্রকাশ করেননি, যা সাংবাদিকদের সাথে কথা বলার সময় নিয়মমাফিক ব্যাপার।
সোমবার আগের দিকে, রাশিয়ার সাথে ইউক্রেনের যুদ্ধের সমাপ্তি “এখনো অনেক, অনেক দূরে আছে” বলে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট যে মন্তব্য করেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প সেটাকে “সব চেয়ে খারাপ বক্তব্য” বলে অভিহিত করেছেন, এবং বলেছেন “আমেরিকা আর বেশি দিন এসব মেনে নিবে না।”
গত শুক্রবার হোয়াইট হাউসে ট্রাম্প আর প্রেসিডেন্ট ভলদিমির জেলেন্সকির মধ্যে বাক-বিতণ্ডা হওয়ার পর তারা সোমবার যুদ্ধের সম্ভাব্য পরিসমাপ্তি নিয়ে তারা আবার বাকযুদ্ধে লিপ্ত হন।
রবিবার অব্যাহত সামরিক সাহায্য পাওয়ার ব্যাপারে ইউরোপিয়ান নেতাদের কাছ থেকে সমর্থন পাওয়ার পর লন্ডন ছাড়ার আগে জেলেন্সকি অভিমত দেন যে যুদ্ধ শীঘ্রই শেষ হবার সম্ভাবনা কম। তিনি বলেন যে, যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকেও সামরিক সাহায্য অব্যাহত থাকবে বলে তিনি প্রত্যাশা করছেন। যুক্তরাষ্ট্র ইউক্রেনের সবচেয়ে বড় সামরিক সহায়তাদানকারী দেশ।
“আমার মনে (যুক্তরাষ্ট্রের সাথে) সম্পর্ক অব্যাহত থাকবে, কারণ এটা মাঝে-মধ্যে যোগাযোগ হওয়া সম্পর্কের চেয়ে বেশি কিছু,” জেলেন্সকি বলেন। “আমার বিশ্বাস সাহায্য অব্যাহত রাখার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ইউক্রেনের সম্পর্ক যথেষ্ট জোরালো।”
তবে ট্রাম্প জেলেন্সকির উপসংহার নিয়ে আপত্তি তুলে সামাজিক মাধ্যম ট্রুথ সোশালে সোমবার বলেন, “আমি যেটা বলছিলাম, যত দিন আমেরিকার সমর্থন পাবে ততদিন এই লোক শান্তি চাইবে না। আর ইউরোপ, জেলেন্সকির সাথে তাদের বৈঠকে সরাসরি বলে দিল যে তারা যুক্তরাষ্ট্রকে ছাড়া কাজটা করতে পারবে না।”
“রাশিয়ার সামনে শক্তি প্রদর্শনের ক্ষেত্রে হয়তো এই কথা খুব একটা দারুণ বক্তব্য ছিলনা,” ট্রাম্প বলেন। “তারা কী ভাবছিল?”
জেলেন্সকি পরে সামাজিক মাধ্যম এক্স-এ বলেন, “এই যুদ্ধ যত শীঘ্র সম্ভব শেষ করার জন্য আমাদের কূটনীতিকে জোরালো করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।”
“আমরা আমাদের আমেরিকান এবং ইউরোপিয়ান পার্টনারদের সাথে কাজ করছি, এবং শান্তির পথে যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন আশা করছি," জেলেন্সকি বলেন। “যত শীঘ্র সম্ভব শান্তি প্রয়োজন।”
ট্রাম্প যুদ্ধ শেষ করার জন্য তাগাদা দিয়ে আসছেন, যে যুদ্ধে কয়েক লক্ষ রুশ এবং ইউক্রেনীয় সৈন্য নিহত হয়েছে, সাথে ইউক্রেনের বেসামরিক লোকও আছে। কিন্তু জেলেন্সকি আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন যে ট্রাম্প কিয়েভের চেয়ে মস্কোর জন্য বেশি সুবিধাজনক শর্তে সংঘাত সমাধানের চেষ্টা করছেন।
বর্তমানে রাশিয়া ইউক্রেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত এলাকার এক-পঞ্চমাংশ নিয়ন্ত্রণ করে, এবং তারা ইউক্রেনের পূর্বাঞ্চলে ধীরে ধীরে আরও এলাকা দখল করছে। এখনও কোন শান্তি আলোচনার সময় ঠিক করা হয়নি।
জেলেন্সকি খনিজ চুক্তি নিয়ে আশাবাদী
ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেন্সকি রবিবার বলেছেন, তার দেশ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে খনিজ চুক্তি স্বাক্ষর করতে এখনও প্রস্তুত এবং তিনি বিশ্বাস করেন, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে সম্পর্ক পুনরুদ্ধার করতে তিনি সক্ষম।
ব্রিটেনে ইউরোপীয় নেতাদের সমাবেশের পর সংবাদদাতাদের জেলেন্সকি বলেন, তিনি মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্রও খনিজ চুক্তিতে স্বাক্ষর করতে প্রস্তুত, তবে “কিছু বিষয় বিশ্লেষণ করতে সময় লাগতে” পারে।
গত সপ্তাহে জেলেন্সকির হোয়াইট হাউস সফরের সময় দুই পক্ষ চুক্তি স্বাক্ষর করবে বলে ধারণা করা হয়েছিল, তবে ট্রাম্প ও যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের সঙ্গে বৈঠক চলাকালে উত্তপ্ত বাক্যবিনিময়ের পর সমস্ত আয়োজন ভেস্তে যায়।
পুতিনকে নিয়ে উদ্বেগ
জেলেন্সকি রবিবার বলেন, রাশিয়ার তিন বছরব্যাপী আগ্রাসনের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে ইউক্রেন যুক্তরাষ্ট্রের সাহায্যের উপর অনেকখানি নির্ভর করে।
জেলেন্সকি বলেছেন, “আমার মনে হয়, এই ধরনের সহায়তা বন্ধ করে দেওয়া (রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির) পুতিনকেই সাহায্য করবে এবং এই কারণেই আমি মনে করি, যুক্তরাষ্ট্র, সভ্য জগতের প্রতিনিধি ও বিশ্বের নেতারা অবশ্যই পুতিনকে সাহায্য করবেন না।”
শুক্রবারের বৈঠকে ট্রাম্প জেলেন্সকিকে অকৃতজ্ঞ বলে তীব্র ভর্তসনা করেন এবং তিনি খনিজ চুক্তির দাবি করেন; রাশিয়ার বিরুদ্ধে লড়াইয়ে ইউক্রেনকে যুক্তরাষ্ট্র কোটি কোটি ডলার দিয়ে সাহায্য করেছে এবং এই চুক্তি সেই অনুদান পরিশোধের একটা উপায়।
ট্রাম্প এই যুদ্ধ বন্ধের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রচার করেছেন এবং পুতিনের সঙ্গে এই বিষয়ে ফোনালাপ করেছেন। পাশাপাশি, সম্ভাব্য শান্তিচুক্তি নিয়ে আলোচনা করতে যুক্তরাষ্ট্রের সিনিয়র কর্মকর্তারা সৌদি আরবে রুশ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন, তবে এই বৈঠক হয় ইউক্রেনের কর্মকর্তাদের বাদ রেখে।
ট্রাম্প তার ট্রুথ সোশ্যাল মাধ্যমে রবিবার পোস্ট করেছেন, “পুতিনকে নিয়ে উদ্বেগ কমিয়ে আমাদের বরং অভিবাসী ধর্ষক দল, মাদক মাফিয়া, খুনি, মানসিক স্বাস্থ্য কেন্দ্র থেকে আমাদের দেশে আসা মানুষদের নিয়ে বেশি উদ্বিগ্ন হওয়া উচিত, যাতে আমাদের অবস্থা ইউরোপের মতো না হয়।”
লন্ডনে রবিবার বৈঠকে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কির স্টারমার ১৮টি মিত্র দেশকে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র যেহেতু ইউক্রেনের উপর থেকে সাহায্যের হাত সরিয়ে নিচ্ছে, সেহেতু ইউরোপ এখন “ইতিহাসের এক সন্ধিলগ্নে” দাঁড়িয়ে রয়েছে। এরপরই ট্রাম্প ওই মন্তব্য করেছেন।
স্টারমার বলেন, “এটা আরও বৈঠকের সময় নয়, বরং এটা পদক্ষেপ নেওয়ার সময়। ন্যায্য ও টেকসই শান্তির লক্ষ্যে নতুন পরিকল্পনা ঘিরে অগ্রসর হওয়া, নেতৃত্ব দেওয়া ও ঐক্যবদ্ধ হওয়ার সময় এটা।”