ইসরায়েল রবিবার (২ মার্চ) গাজায় সকল ধরনের সামগ্রী প্রবেশ বন্ধ করে দিয়ে বলেছে, হামাস যদি যুদ্ধবিরতির প্রথম পর্ব দীর্ঘায়িত করার প্রস্তাবে রাজী না হয়, তাহলে “আরও পরিণতির” মুখে পড়তে হবে।
হামাস অভিযোগ করে যে, ইসরায়েল বর্তমান যুদ্ধবিরতি চুক্তি ভণ্ডুল করার চেষ্টা করছে। তারা ত্রাণ সরবরাহ বন্ধ করার ইসরায়েলি পদক্ষেপকে যুদ্ধ বিরতির উপর “নির্লজ্জ আক্রমণ এবং একটি যুদ্ধাপরাধ” বলে বর্ণনা করে।
এক বছরের বেশি সময় ধরে আলোচনার পর যুদ্ধবিরতি জানুয়ারি মাসে শুরু হয়। দু’পক্ষের কেউই বলেনি যে যুদ্ধবিরতি শেষ হয়েছে।
যুদ্ধবিরতির প্রথম পর্ব, যার অধীনে ত্রাণ সরবরাহ ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পায়, শনিবার শেষ হয়। দু’পক্ষ যুদ্ধবিরতির দ্বিতীয় পর্ব নিয়ে আলোচনা এখনো শুরু করেনি। দ্বিতীয় পর্বে হামাসের হাতে বাকি জিম্মিদের ছেড়ে দেয়া এবং ইসরায়েলি বাহিনী গাজা থেকে প্রত্যাহারসহ স্থায়ী যুদ্ধবিরতি শুরু হওয়ার কথা।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন ইসরায়েলি কর্মকর্তা বলেন যে, ত্রাণ সরবরাহ থামানোর সিদ্ধান্ত ট্রাম্প প্রশাসনের সাথে সমন্বয় করে নেয়া হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রর পক্ষ থেকে ইসরায়েলের প্রস্তাব বা ত্রাণ বন্ধ করতে তাদের সিদ্ধান্ত নিয়ে তাৎক্ষণিক কোন মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
ইসরায়েলের নতুন প্রস্তাব
জানুয়ারির ১৯ তারিখে যুদ্ধবিরতি শুরু হওয়ার পর থেকে প্রতিদিন শত শত ত্রাণবাহী ট্রাক গাজায় প্রবেশ করেছে। ত্রাণ বন্ধ করার কী প্রভাব পড়তে পারে, তা তাৎক্ষণিকভাবে পরিষ্কার নয়।
ইসরায়েল বলছে তাদের নতুন প্রস্তাবে যুদ্ধবিরতির প্রথম পর্ব মুসলমানদের পবিত্র রমজান মাস এবং ইহুদী পাসওভার ছুটি, যা ২০ এপ্রিল শেষ হবে, সেই পর্যন্ত দীর্ঘায়িত করার কথা বলা হয়েছে। ইসরায়েল বলছে, নতুন প্রস্তাবের ভাবনা আসে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যপ্রাচ্য দূত স্টিভ উইটকফ-এর কাছ থেকে।
ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর দফতর জানিয়েছে, প্রস্তাবের অধীনে হামাস জিম্মিদের অর্ধেক সংখ্যা প্রথম দিন ছেড়ে দেবে এবং স্থায়ী যুদ্ধবিরতি নিয়ে চুক্তি হওয়ার পর বাকি জিম্মিরা মুক্তি পাবে।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী গিডিওন সার বলেন, ইসরায়েল পরবর্তী পর্ব নিয়ে আলোচনা করতে প্রস্তুত, কিন্তু তারা আলোচনার সময় আরও জিম্মি মুক্তির উপর জোর দিচ্ছে। তিনি বলেন, বাইডেন প্রশাসন থেকে তাদের একটি চিঠি দেয়া হয়, যেখানে বলা হয় যে প্রথম পর্ব থেকে দ্বিতীয় পর্বে উত্তরণের কোন সরাসরি পথ নেই।
“আমরা (প্রথম পর্বে) আমাদের অঙ্গীকার শেষ দিন, গতকাল শনিবার পর্যন্ত পুড়ন করেছি,” তিনি সংবাদ সম্মেলনে বলেন। “আমাদের অবস্থান হচ্ছে, আলোচনার সময় জিম্মিদের মুক্তি দিতে হবে।”
হামাসের বক্তব্য
হামাস, যাদের যুক্তরাষ্ট্র একটি সন্ত্রাসী গোষ্ঠী হিসেবে চিহ্নিত করে, হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছে যে, যুদ্ধবিরতি চুক্তি বাতিল বা বিলম্বিত করার চেষ্টা করা হলে জিম্মিদের জন্য “মানবিক পরিণতি” হতে পারে। তারা বলে যে, জিম্মিদের মুক্ত করার একমাত্র পথ হচ্ছে বর্তমান চুক্তি বাস্তবায়ন করা, যেখানে বাকি বন্দীদের ছেড়ে দেয়ার ব্যাপারে কোন সময়সীমা বেঁধে দেয়া হয়নি।
হামাস বলেছে তারা দ্বিতীয় পর্বে এক যোগে বাকি সকল জিম্মিদের মুক্তি দিতে ইচ্ছুক, কিন্তু সেটা হবে শুধুমাত্র আরও ফিলিস্তিনি বন্দীর মুক্তি, একটি স্থায়ী যুদ্ধবিরতি এবং ইসরায়েলি বাহিনী প্রত্যাহারের বিনিময়ে।
একজন মিশরীয় কর্মকর্তা জানিয়েছেন, হামাস এবং মিশর যুদ্ধের অবসান ছাড়া বাকি জিম্মিদের মুক্তি নিয়ে নতুন কোন প্রস্তাব গ্রহণ করবে না। কর্মকর্তা বলেন, চুক্তিতে ফেব্রুয়ারির শুরুর দিকে দ্বিতীয় পর্ব নিয়ে আলোচনার জন্য দুই পক্ষের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছিলো।
এই কর্মকর্তা, যার মিডিয়ার সাথে কথা বলার অনুমতি না থাকায় নাম প্রকাশ করেননি, বলেন যে মধ্যস্ততাকারীরা সমস্যা সমাধান করার চেষ্টা করছে।
যুদ্ধবিরতি চুক্তির প্রথম, ছয়-সপ্তাহের পর্বে হামাস ২৫জন জীবিত জিম্মিকে মুক্তি এবং আটটি মৃত দেহ ফেরত দেয়। বিনিময়ে ইসরায়েলি কারাগার থেকে প্রায় ২,০০০ ফিলিস্তিনি বন্দী মুক্তি পায়। ইসরায়েলি বাহিনী গাজার বেশির ভাগ এলাকা থেকে সড়ে আসে এবং ত্রাণসামগ্রীর সরবরাহ ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পায়।
হামাস ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর দক্ষিণ ইসরায়েলে হামলা চালিয়ে ১,২০০জনকে হত্যা এবং ২৫১জনকে জিম্মি করে নিয়ে যাওয়ার পর যুদ্ধ শুরু হয়। বর্তমানে ৫৯জন জিম্মি হামাসের হাতে রয়েছে, যাদের ৩২জন মারা গেছে বলে ধারণা করা হয়। বাকি জিম্মিদের দুই দফা যুদ্ধবিরতির সময় মুক্তি দেয়া হয়।
গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের হিসেব অনুযায়ী, ইসরায়েলের আক্রমণে ৪৮,০০০ এর বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছে, তাদের অর্ধেকের বেশি নারী ও শিশু। তবে নিহতদের কয়জন সশস্ত্র যোদ্ধা ছিল, তা বলা হয়নি।
ইসরায়েলের বোমাবর্ষণ এবং স্থল অভিযানে গাজা ভূখণ্ডের ব্যাপক এলাকা বিধ্বস্ত হয় এবং সংঘাতের এক পর্যায়ে গাজার ২৩ লক্ষ বাসিন্দার ৯০ শতাংশ বাস্তচ্যতু হয়। যুদ্ধের ফলে গাজার অধিকাংশ মানুষ খাদ্য এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় সামগ্রীর জন্য আন্তর্জাতিক ত্রাণের উপর নির্ভর হয়ে পড়েছে।