জার্মানির সম্ভাব্য আগামি চান্সালার সতর্ক করে দিয়েছেন যে ইউরোপের ভবিষ্যৎ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র পরোয়া করছে না। তিনি ইউরোপকে অবিলম্বে নিজেদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সংগঠিত করার আহ্বান জানান। তাঁর এই আহ্বান ইউরোপের বৃহত্তম অর্থনীতির চিন্তায় বড় রকমের পরিবর্তনের আভাস দিচ্ছে।
তাঁর ক্রিশ্চিয়ান ডেমক্র্যাট বা সিডিইউ দল রবিবারের ভোটে ২৮.৫% ভোট পেয়ে দ্বিতীয় স্থানে থাকা অল্টারনেটিভ ফর জার্মানি পার্টি (এএফডি)’র চেয়ে ৮% এগিয়ে থাকায় নির্বাচনোত্তর টেলিভিশন বিতর্কে ফ্রাইডরিক মার্জ বলেন,“আমি কখনই ভাবিনি যে টিভি শোতে আমাকে এমন কিছু বলতে হবে । তবে গত সপ্তাহে ডনাল্ড ট্রাম্পের মন্তব্যের পর এটা স্পষ্ট যে আমেরিকানরা – কিংবা বলতে পারেন এই প্রশাসনের আমেরিকানরা – ইউরোপের ভবিষ্যৎ নিয়ে তেমন একটা পরোয়া করে না। আমার নিশ্চিত অগ্রাধিকার থাকবে যথা শিগগির সম্ভব ইউরোপকে শক্তিশালী করা যাতে ধাপে ধাপে আমরা যুক্তরাষ্ট্র থেকে প্রকৃতপক্ষে স্বাধীন হতে পারি”।
তিনি বলেন জুন মাসের নেটো সম্মেলন একটা গুরুত্বপূর্ণ মূহুর্ত হবে । তিনি আরও বলেন এটা জানা নেই যে মিত্ররা “এখনও কি নেটোকে তার বর্তমান রূপে দেখতে চাইবেন না কি আমাদেরকে আরও তাড়াতাড়ি একটি স্বাধীন ইউরোপীয় প্রতিরক্ষা সক্ষমতা গড়ে তুলতে হবে”।
ইউক্রেনের প্রতি সমর্থন
ওয়াশিংটন কেন্দ্রিক কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশান্সের লিয়ানা ফক্স’এর মতে এখন পর্যন্ত জর্মানি হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের পর ইউক্রেনের জন্য দ্বিতীয় বৃহত্তম সামরিক সাহায্যদাতা দেশ। মার্জ সেই সহায়তা বৃদ্ধি করার চেষ্টা করতে পারেন।
ফিক্স ভয়েস অফ আমেরিকাকে বলেন,“ ফ্রাইডরিক মার্জ ইউক্রেনের বিজয়ের সমর্থনে কথা বলেছেন। সাধারণ ভাবে বলা যায়, তিনি [বিদায়ী চান্সালার] ওলাফ শোলজ’এর চেয়ে আরো বেশি যুদ্ধংদেহী অবস্থান নিয়েছেন। তিনি ইউক্রেনকে দূরপাল্লার টরাস ক্ষেপণাস্ত্র সরবরাহ করার পক্ষে কথা বলেছেন। তিনি স্পষ্ট করে বলেছেন যে অস্ত্রবিরতি চুক্তি সম্পন্ন হলেও, ইউক্রেনের প্রতি সমর্থন অব্যাহত রাখতে হবে”।
ইউক্রেনের উপর রাশিয়ার পুরোদমে আক্রমণের তৃতীয় বার্ষিকীর প্রাক্কালে মার্জের এই নির্বাচনী বিজয় আসলো।
শীতল যুদ্ধের সময়ে পূর্ব ও পশ্চিম বার্লিনের এক সময়কার সীমান্ত দ্য ব্র্যান্ডেনবার্গ গেইটকে এই যুদ্ধের বার্ষিকী উপলক্ষে সোমবার ইউক্রেনের জাতীয় রঙে আলোক সজ্জিত করা হয়।
জার্মান নির্বাচনের সময়ে মস্কো থেকে সম্ভাব্য হুমকির আশংকা ছিল। বার্লিনের এক বাশিন্দা জুয়ের্গেন হার্ক, যিনি রাশিয়ার দূতাবাসের সামনে ইউক্রেনের পক্ষে বিক্ষোভে অংশগ্রহণকারীদের অন্যতম একজন, বলেন এটা জরুরি যে মার্জ যেন তাঁর কথা রাখেন।
হার্ক রয়টার্সকে বলেন,“ আমি আশা করছি যে নতুন সরকার ইউক্রেনকে অস্ত্র সরবরাহ অব্যাহত রাখবে, রাশিয়ার বিপরীতে, এবং এখন ট্রাম্পের বিপরীতেও, বড় ধরণের ভারসাম্য রক্ষার জন্য ইউরোপীয় দেশগুলির সঙ্গে একত্রে কাজ করবে।
যুক্তরাষ্ট্রের নীতি পরিবর্তন
ইউক্রেনের প্রতি এবং রাশিয়ার আক্রমণের বিরুদ্ধে ইউক্রেনের প্রতিরক্ষায় যুক্তরাষ্ট্রের নীতিতে ট্রাম্প নাটকীয় পরিবর্তন এনেছেন। এই যুদ্ধ শুরু করার জন্য গত সপ্তাহে তিনি কিয়েভকে ভুল ভাবে দায়ী করেন এবং ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলন্সকিকে একজন “স্বৈরশাসক” বলে আখ্যায়িত করেন।
সোমবার যুক্তরাষ্ট্র রাশিয়ার সঙ্গে মিলিত হয়ে জাতিসংঘে ইউরোপ সমর্থিত একটি প্রস্তাবের বিপক্ষে ভোট দেয়। ওই প্রস্তাবে এই যুদ্ধের জন্য মস্কোকে অভিযুক্ত করা হয় এবং ইউক্রেন থেকে রুশ সৈন্যদের অবিলম্বে প্রত্যাহারের আহ্বান জানানো হয়।
সোমবার ট্রাম্প তাঁর সামাজিক মাধ্যম প্ল্যাটফর্ম ট্রুথ সোশ্যালে মার্জকে অভিনন্দন জানান।
ট্রাম্প বড় অক্ষরে লেখেন,“মনে হচ্ছে এই বিশাল ও প্রচুর প্রত্যাশিত নির্বাচনে জার্মানির রক্ষণশীল দল জয়লাভ করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের মতই জার্মানির জনগণ সাধারণ জ্ঞান প্রসূত কর্মসূচি যেমন জ্বালানি ও অভিবাসন বিষয়ক কর্মসূচির অনুপস্থিতিতে বিরক্ত হয়ে উঠেছিল”।
এ দিকে রাশিয়া বলেছে নতুন জার্মান চান্সালারের সঙ্গে সম্পর্ক কোন দিকে মোড় নেয় সেটা দেখার জন্য তারা অপেক্ষা করবে।
ক্রেমলিনের মুখপাত্র দ্যমিত্র পেসকভ সোমবার সংবাদদাতাদের বলেন, “ প্রতিবারই আমরা বাস্তবতার প্রতি শান্তিপূর্ণ দৃষ্টিকোণ আশা করি, [ রাশিয়া ও জার্মানির মধ্যে] পারস্পরিক স্বার্থ ও পারস্পরিক লাভবান হওয়ার বিষয়গুলির প্রতি শান্তিপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি আশা করি। তবে দেখা যাক বাস্তবে সেটা কেমন হয়”।
ইউরোপের প্রতিরক্ষা
ডুসেলডর্ফে অবস্থিত নীতি পরামর্শক প্রতিষ্ঠান জার্মান-ইউক্রেনিয়ান ব্যুরোর প্রতিষ্ঠাতা মাটিয়া নেলস বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র নীতি আকষ্মিক ভাবে বিপরীতমুখী হওয়ায় ইউরোপ বিস্মিত হয়েছে।
নেলস ভয়েস অফ আমেরিকাকে বলেন,“আমরা, জার্মানি হিসেবে, ইউরোপে আমেরিকার নিরাপত্তা প্রদান, প্যাক্স আমেরিকানা শেষ হওয়ায় দুঃখিত এবং একেবারেই অপ্রস্তুত। আর এখন আমরা শীর্ষ নিরাপত্তা প্রদানকারী যুক্তরাষ্ট্র থেকে যখন আরও ইউরোপীয় ব্যবস্থার দিকে যাচ্ছি তখন এই পরিবর্তনের ব্যবস্থাপনায় আমরা বেশ কঠিন অবস্থানে রয়েছি। । আর এটা কেবল ইউক্রেনের ব্যাপার নয়, আমাদের আত্ম-রক্ষার ব্যবস্থা করাও।
তিনি বলেন, “ এটা হবে এক বিশাল প্রচেষ্টা। এর জন্য প্রয়োজন বড় ধরণের রাজনৈতিক সদিচ্ছা। তবে মার্জ বলেছেন তিনি এতে নেতৃত্ব দিতে রাজি আছেন , আর দেখা যাক আমরা এগিয়ে যেতে পারি কীনা।
ইউরোপ কি নিজের প্রতিরক্ষা ব্যয় বহন করতে সক্ষম?
কাউন্সিল অফ ফরেন রিলেশানসএর ফিক্স বলেন,“ মার্জ ইউরোপীয় পর্যায়ের যৌথ ঋণের ব্যাপারে সহমত হতে পারেন যা কীনা রক্ষনশীলরা বরাবরই পছন্দ করতো না”।
ইউরোপের কাছে বর্তমানে প্রায় ২০ হাজার কোটি ডলারের রাশিয়ার সম্পদ রয়েছে যা কীনা ইউক্রেন আক্রমণের পর জব্দ করা হয়।
ফিক্স আরও বলেন, মার্জ “ রাশিয়ার জব্দ করা সম্পদ নিতে পারেন, সেটা অবশ্য এখনও করা হয়নি কিন্তু হাঙ্গেরির ভেটো প্রদানের আগেই সেটা করা উচিৎ। যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্স যে তাদের পারমাণবিক ছত্রছায়ায় জার্মানিকে নিয়ে ্সতে পারে সে নিয়েও তিনি কথা বলেছেন”।
জার্মান ঋণ
নির্বাচনী প্রচারাভিযানে মার্জ জার্মানির কথিত “ঋণ বিরতি” বহাল রাখাকে সমর্থন করেন যার ফলে সরকারের বার্ষিক ঋণের পরিমাণ মোট অভ্যন্তরীণ উৎপাদনের মাত্র ০.৩৫% তে সীমিত রাখা হয়।
জি-সেভেন জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে জার্মানির বাজেট ঘাটতি সব চেয়ে কম যদিও সমালোচকরা বলছেন এই নীতির কারণে গুরুত্বপূর্ণ বিনিয়োগগুলি বাধা প্রাপ্ত হয়। মার্জ এ রকম আভাস দিয়েছেন যে প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়ানোর জন্য ঋণ বিরতির বিষয়টি আরও শিথিল করা হতে পারে।
উগ্র ডানপন্থিদের প্রতিবন্ধকতা
এএফডি’র চারপাশে কথিত “ফায়ার ওয়াল” বা প্রতিবন্ধকতাকে ওয়াশিংটন তীব্র সমালোচনা করেছে কারণ এ জন্য জার্মানির মধ্যপন্থি দলগুলি সংসদের ভোটের উপর নির্ভরশীল হতে কিংবা উগ্র ডানপন্থিদের সঙ্গে কোন রকম জোটে যেতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে।
এএফডি’র উপ-নেতা এই সব উদ্বেগেরই প্রতিধ্বনি প্রকাশ করেন।
তিনি সোমবার সমর্থকদের বলেন, “ আমরা মনে করি এই প্রতিবন্ধকতা অগণতান্ত্রিক । আপনার লক্ষ লক্ষ ভোটদাতাকে বাদ দিতে পারেন না।
এর পরিবর্তে মার্জ বিদায়ী চান্সালার ওলাফ শোলজ’এর সোশ্যাল ডেমক্র্যট দলের সঙ্গে জোট গঠনের বিষয়ে আলোচনা করার পরিকল্পনা করছেন।
নেলস বলেন, “ রক্ষনশীলদের এখন আপোসরফা করতে হবে এবং সুর পাল্টাতে হবে এবং কঠিন বিষয়গুলির ব্যাপারে সোশ্যাল ডেমক্র্যাটদের সঙ্গে গঠনমূলক সমঝোতায় পৌঁছোতে হবে। এই বিষয়গুলির মধ্যে রয়েছে জার্মানিতে অভিবাসন থেকে শুরু করে ঋণ সংস্কার, জন অর্থায়ন, জার্মানির অর্থনীতির মডেলকে এঢেল সাজানো এবং অবশ্যই ইউক্রেন”।
মার্জ সোমবার বলেন যে তিনি আশা করছেন ঈস্টারের আগেই একটি জোট সরকার গঠন করা সম্ভব হবে।