মঙ্গলবার সিরিয়ার অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট বলেন পূণঃনির্মাণের জন্য তাঁর দেশের এক ‘ঐতিহাসিক সুযোগ’ তৈরি হয়েছে। কয়েক দশক ধরে আসাদের পারিবারিক শাসনের পর সিরিয়ার ইসলামপন্থিদের ডাকা গুরুত্বপূর্ণ এই জাতীয় সংলাপে দেওয়া ভাষণে তিনি এই মন্তব্য করেন।
দামেস্কের প্রেসিডেন্ট ভবনে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে লাল গালিচার উপর দিয়ে হেঁটে শত শত সিরিয়াবাসী এই অনুষ্ঠানে যোগ দেন। গত বছর হায়াত তাহরির আল-শাম(এইচটিএস) ‘এর নেতৃত্বে বিদ্রোহীদের অভুত্থানে সাবেক প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদ ক্ষমতাচ্যূত হওয়ার আগে পর্যন্ত এই লাল গালিচা সম্বর্ধনা সীমিত ছিল কেবল মাত্র কিছু বিশেষ বিদেশি অতিথিদের জন্য যাঁরা বাশারের সঙ্গে দেখা করতেন।
হায়াত তাহরির আল-শাম(এইচটিএস) ‘এর প্রধান, আহমেদ আল-শারাকে গত মাসে বিদ্রোহী সামরিক কমান্ডাররা দেশের অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট হিসেবে ঘোষণা করেন এবং দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনার জন্য তিনি দ্রুতই জাতীয় সংলাপ আয়োজনের প্রতিশ্রুতি দেন।
মঙ্গলবার তিনি তাঁর উদ্বোধনী ভাষণে বলেন,“সিরিয়া নিজেকে নিজেই মুক্ত করেছে, আর নিজেকে নিজেই নির্মাণ করাই তাকে সাজে”।
তিনি বলেন,“আজ আমরা যেখানে রয়েছি, সেটা ব্যতিক্রমী, ঐতিহাসিক এবং দুষ্প্রাপ্য এক সুযোগ। আমাদের জনগণের এবং আমাদের দেশের স্বার্থের জন্য আমাদেরকে এর সুযোগ নিতে হবে”।
শারা জোর দিয়েই বলেন সিরিয়ায় বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীকে অভিন্ন এক সামরিক কমান্ডের অধীনে একত্রিত হতে হবে। তিনি বলেন,“একতাতেই নিহিত শক্তি”।
অংশগ্রহণকারীরা ছয়টি কার্যকরী গ্রুপে বিভক্ত হয়ে অন্তর্বর্তী বিচার ব্যবস্থা; সংবিধান; রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বিনির্মাণ; ব্যক্তি স্বাধীনতা; ভবিষ্যতে সিরিয়ার অর্থনৈতিক মডেল এবং দেশের নাগরিক সমাজের ভূমিকা নিয়ে আলেচনা করেন।
এই আলোচনাটি ছিল গোপনীয়, সঞ্চালক প্রতিটি অংশগ্রহণকারিকে কথা বলার জন্য দু মিনিট করে সময় দেন এবং ওই শীর্ষ বৈঠকের কক্ষ থেকে কোন নথিপত্র অন্যত্র সরানোর উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেন।
আয়োজকরা বলছেন দিনের শেষে যে সব সুপারিশে সম্মতি পাওয়া যাবে তা সাংবিধানিক ঘোষণার রূপ দিতে পারবে যার লক্ষ্য হবে সিরিয়ার নতুন শাসন প্রণালীর মূল নীতিগুলি প্রণয়ন করা। এই বিষয়গুলি বিবেচনা করবে একটি নতুন অন্তর্বর্তী সরকার যারা ১ মার্চ ক্ষমতা গ্রহণ করতে যাচ্ছে।
প্রস্তাবকরা বলছেন এই প্রক্রিয়া কয়েক দশক ধরে চলে আসা আসাদ সরকারের স্বৈরাচারী শাসন থেকে লক্ষ্যযোগ্য ভাবেই পৃথক যখন রাজনৈতিক ভিন্নমতাবলম্বীদের জটিল এক কারারুদ্ধ ব্যবস্থায় আটক রাখা হতো।
তবে সমালোচকরা তাড়াহুড়ো করে এই শীর্ষ বৈঠকের প্রস্তুতি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন, তা ছাড়া সংখ্যালঘুদের প্রতিনিধিত্বের অভাব এবং এ পর্যন্ত এইচটিএস পরিচালিত রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার কতটা প্রভাব ফেলবে তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
তিনজন কূটনীতিক বলেন, এই শীর্ষ বৈঠকের প্রতি নিবিড় নজর রাখছে আরব দেশগুলি ও পশ্চিমি দেশগুলিও যারা সিরিয়ার নতুন নেতাদের সঙ্গে সম্পর্ক পুরোদমে ঘনিষ্ঠ করেছেন- সম্ভবত নিষেধাজ্ঞা তুলে নিতে চলেছেন – অবশ্য তা নির্ভর করছে, রাজনৈতিক প্রক্রিয়া সিরিয়ার জাতিগোষ্ঠীগত ও ধর্মীয় ভাবে নানান জনসংখ্যাকে অন্তর্ভুক্ত করার উপর।
সিরিয়ায় তিনজন বিদেশী রাষ্ট্রদূত বলেন, এই সম্মেলনে সিরিয়ায় অবস্থিত কূটনীতিকদের আমন্ত্রণ জানানো হয়নি। জাতিসংঘ এই সম্মেলনে সাহায্য দানের প্রস্তাব করেছিল, আয়োজকরা তা গ্রহণ করেননি।
জাতিসংঘ, যুক্তরাষ্ট্র এবং অন্যান্য দেশ গোষ্ঠী হিসেবে এইচটিএস’এর উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে । যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নেরও সিরিয়ার উপর ব্যাপক নিষেধাজ্ঞা রয়েছে তবে সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলিতে কোন কোন ক্ষেত্রে সাময়িক ভাবে নিষেধাজ্ঞা তুলে নিয়েছে।
শারার পর সিরিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদ আল-শিবানি তাঁর ভাষণে এখনো বহাল আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার সমালোচনা করে বলেন এগুলো “ সিরিয়ার জনগণের ইচ্ছার উপর চাপ সৃষ্টির উপায় হিসেবে” ব্যবহার করা হচ্ছে।
তাঁর মন্তব্যের পর, সেখানে উপস্থিত এক নারী দাঁড়িয়ে চিৎকার করে বলেন, “আল্লাহর প্রতি শোকর, পিপলস প্যালেস পিপলের(জনগণের) কাছেই ফিরে এসেছে”!
কমিটির সদস্যদের পাঁচ জন হয় এইচটিএস ‘এর সদস্য অথবা ওই গোষ্ঠীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ তবে সেখানে কোন দ্রুজ বা আলাওয়াইত সদস্য ছিলেন না। এই দু’টি গোষ্ঠীই সিরিয়ায় উল্লেখযোগ্য সংখ্যালঘু গোষ্ঠী
উত্তর-পূর্ব সিরিয়ার কূর্দি নেতৃত্বাধীন স্বায়ত্বশাসিত প্রশাসনের কিংবা যুক্তরাষ্ট্র সমর্থিত সিরিয়ান ডেমক্র্যাটিক ফোর্সেসের কোন সদস্যকেও এই আয়োজনে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি বলে রয়টার্সকে জানিয়েছেন উভয় গোষ্ঠীর কর্মকর্তারা।