গত বছরের সেপ্টেম্বরে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে, তখন থেকে আঠারো মাসের মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠান নিয়ে যে বক্তব্য দিয়েছিলেন, সরকার এখন সেদিকেই ধাবিত হচ্ছে বলে মনে করছেন বাংলাদেশের সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান।
২০০৯ সালে তৎকালীন বিডিআর (বর্তমান বিজিবি) সদর দপ্তর পিলখানায় সংঘটিত নির্মম হত্যাকাণ্ডে মৃত সেনা কর্মকর্তাদের স্মরণে মঙ্গলবার (২৫ ফেব্রুয়ারি) সকালে এক অনুষ্ঠানে সেনাপ্রধান এ কথা বলেন।
ওয়াকার-উজ-জামান বলেন, "আমরা দেশে একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের দিকে যাচ্ছি। তার আগে যেসব সংস্কার করা প্রয়োজন, অবশ্যই সরকার সেদিকে খেয়াল করবেন। যতবার ড. ইউনূসের সাথে কথা বলেছি, ততবার তিনি আমার সাথে একমত হয়েছেন যে একটি অবাধ-সুষ্ঠু নির্বাচন হওয়া দরকার এবং সেই নির্বাচন ডিসেম্বরের মধ্যে হতে হবে। যেটা আমি প্রথমেই বলেছিলাম আঠারো মাসের মধ্যে একটি নির্বাচন। আমার মনে হচ্ছে সরকার সেদিকে ধাবিত হচ্ছে। ড. ইউনূস যথাসাধ্য চেষ্টা করে যাচ্ছেন দেশটিকে ঐক্যবদ্ধ রাখতে। তাকে আমাদের সাহায্য করতে হবে।"
গত ২৩ সেপ্টেম্বর, বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে, বাংলাদেশে গুরুত্বপূর্ণ সংস্কারগুলো সম্পন্ন করার মাধ্যমে দেশে আগামী আঠারো মাসের মধ্যে অন্তর্বর্তী সরকার বাংলাদেশে একটি গ্রহণযোগ্য জাতীয় নির্বাচন আয়োজন করতে যেন সক্ষম হয়, সেজন্য অন্তর্বর্তী সরকারকে তার দৃঢ় সমর্থন দিয়ে যাবার কথা জানান বাংলাদেশের সেনা প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান।
তবে ২৭ সেপ্টেম্বর, সেনা প্রধানের বক্তব্যের সূত্র ধরে ১৮ মাসের মধ্যে নির্বাচন হতে পারে এ কথা থেকে কি ধরে নেয়া যায় যে, অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদ হবে ১৮ মাস, ভয়েস অফ আমেরিকার সাক্ষাৎকারে এ প্রশ্নটি করা হলে, জবাবে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান, মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, "সেটা আপনি ইচ্ছা করলে ধরতে পারেন। কিন্তু, সরকারের মতামত তো না সেটা। সরকার তো কোনো মত দেয়নি এ পর্যন্ত। কাজেই সরকার কখন মেয়াদ ঠিক করবে সেটা সরকারকে বলতে হবে। সরকার না বলা পর্যন্ত সেটা তো সরকারের মেয়াদ হচ্ছে না।"
বিষয়টি পরিষ্কার করতে ইউনূস আরো বলেন, "আমাদেরই বলতে হবে। আমাদেরকেই বলতে হবে। আমাদের মুখ থেকে যখন শুনবেন তখন সেটাই হবে তারিখ।"
ভিওএ'র সাক্ষাৎকারের মাস তিনেকের মধ্যে নির্বাচনের তারিখ নিয়ে একটি ধারণা দেন ডঃ ইউনূস। গত বছরের ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশের বিজয় দিবসে জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে তিনি বলেন, “২০২৫ সালের শেষের দিকে নির্বাচন অনুষ্ঠান হয়তো সম্ভব হবে। আর যদি এর সঙ্গে নির্বাচন প্রক্রিয়া এবং নির্বাচন সংস্কার কমিশনের সুপারিশের পরিপ্রেক্ষিতে এবং জাতীয় ঐকমত্যের ভিত্তিতে প্রত্যাশিত মাত্রার সংস্কার যোগ করি তাহলে আরও অন্তত ৬ মাস অতিরিক্ত সময় লাগতে পারে।"
"মোটাদাগে বলা যায়, ২০২৫ সালের শেষ দিক থেকে ২০২৬ সালের প্রথমার্ধের মধ্যে নির্বাচনের সময় নির্ধারণ করা যায়,” এমন ঘোষণা দিয়েছেন বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা।
নির্বাচনের তারিখ নিয়ে আলোচনায় নতুন বিষয় যোগ করেন অন্তবর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম। তিনি ৫ ফেব্রুয়ারি জানান, জাতীয় নির্বাচন এ বছরের শেষ নাগাদ, নাকি ২০২৬ সালে জুনের মধ্যে হবে, তা নির্ভর করছে 'জুলাই চার্টার' এর ওপর।
রাজনৈতিক দলগুলো যেখানে নির্বাচনের কথা বলছে, সেখানে বর্তমান সরকার কী এমন কোনো পদক্ষেপ নেবে যে সুপারিশগুলো বাস্তবায়ন করতেই হবে, প্রশ্নে শফিকুল আলম বলেন, “যেসব সুপারিশে সবাই একমত হবে, রাজনৈতিক দলগুলো সেখানে সই করবে। এরপর যেটা দাঁড়াবে, সেটা হবে জুলাই চার্টার। সেটার বাস্তবায়ন বর্তমান সরকার কিছু করবে, পরবর্তী সরকার কিছু করবে। আর সেই বাস্তবায়নের ওপর নির্ভর করবে—নির্বাচন এ বছরের ডিসেম্বর নাগাদ নাকি আগামী বছরের জুনের মধ্যে হবে।”
ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মুখে গত বছরের ৫ অগাস্ট তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পদত্যাগ করে ভারতে চলে যান। সরকারের পতনের পর ৮ অগাস্ট ডঃ মুহাম্মদ ইউনূস বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
এর পর থেকেই সংসদ নির্বাচন এবং তার সময়কাল নিয়ে রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে ব্যাপক আলোচনা চলছে।
নির্বাচন কমিশনের প্রস্তুতি চলছে
বাংলাদেশে বাড়ি বাড়ি গিয়ে ভোটার তালিকা হালনাগাদ কার্যক্রম শুরু হচ্ছে আগামী ২০ জানুয়ারি থেকে। সেই লক্ষ্যে তথ্য সংগ্রহকারী ও সুপারভাইজারদের ‘প্রশিক্ষকদের প্রশিক্ষণ’ অনুষ্ঠান ৫ জানুয়ারি থেকে শুরু হয়েছে।
ধাপে ধাপে প্রশিক্ষকদের প্রশিক্ষণ দেওয়ার পর পৌনে একলাখ জনবল তৈরি করা হবে এ কর্মসূচির আওতায়।
হালনাগাদ খসড়া ভোটার তালিকা অনুযায়ী বাংলাদেশে এখন মোট ভোটার ১২ কোটি ৩৬ লাখ ৮৩ হাজার ৫১২ জন।
নির্বাচন কমিশনার মোহাম্মদ আনোয়ারুল ইসলাম ১০ ফেব্রুয়ারি বলেছেন, ২০২৫ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানের লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে নির্বাচন কমিশন।
প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিন ১৯ জানুয়ারি জানিয়েছিলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের ঘোষণা করা সময়সীমা মাথায় রেখে নির্বাচন কমিশন (ইসি) নির্বাচনের জন্য কাজ করে যাচ্ছে।
তিনি বলেন, “মাননীয় প্রধান উপদেষ্টা ঘোষিত যে সময়সীমা (টাইম ফ্রেম), ওইটাকে মাথায় রেখে আমরা কাজ করছি।”
নির্বাচন নিয়ে সরকারের অবস্থানে অসন্তুষ্ট বিএনপি নেতৃত্ব
বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দল বিএনপি’র নেতারা অভিযোগ করেছেন যে, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার নির্বাচন নিয়ে টাল-বাহানা করছে।
রাজধানীর বেইলি রোডে ১৫ ফেব্রুয়ারি প্রধান উপদেষ্টার ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সঙ্গে বৈঠকের পর সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে জাতীয় নির্বাচন সবার আগে, তারপরই স্থানীয় নির্বাচনের বিষয়ে বিএনপি নিজেদের অবস্থান পরিষ্কার করে বলে দিয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।
মির্জা ফখরুল বলেন, “রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের প্রথম সভায় বসেছিলেন কমিশনের প্রধান ড. মুহাম্মদ ইউনূস। এতে তিনি সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে কথা বলেছেন। সংস্কার প্রতিবেদনগুলো নিয়ে আলোচনার বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোকে তিনি আহ্বান জানিয়েছেন। এতে দলগুলো কমিশনগুলোর সঙ্গে কথা বলবে, এরপর একটি ঐকমত্যে পৌঁছানোর চেষ্টা করা হবে।”
তিনি বলেন, “এটিই ছিল আজকের (বৈঠকের) মূল কথা ও প্রাথমিক আলোচনা। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল বিভিন্নভাবে কথা বলেছেন। আমরা আশা করছি, খুব দ্রুত সময়ের মধ্যে সংস্কারের জন্য ঐকমত্য তৈরি হবে; সেটার ওপর ভিত্তি করে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। এটিই আমাদের প্রত্যাশা।”
জাতীয় নাকি স্থানীয় নির্বাচন—কোনটি আপনারা আগে চাচ্ছেন, জানতে চাইলে মির্জা ফখরুল বলেন, “আমরা পরিষ্কারভাবে বলেছি, জাতীয় নির্বাচন সবার আগে হতে হবে, তারপরে স্থানীয় (সরকার) নির্বাচন।”
জাতীয় নির্বাচনের আগে স্থানীয় সরকার নির্বাচন হবে কিনা; খুব দ্রুতই সে বিষয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের সিদ্ধান্ত আসবে বলে ১৮ ফেব্রুয়ারি জানিয়েছেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া। নিরাপরাধ আওয়ামী লীগ নেতারা ক্ষমা চেয়ে স্থানীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে পারবেন বলেও জানান তিনি।
সংস্কারে ঐকমত্যে পৌঁছানোর পর নির্বাচন হোক: জামায়াত
প্রয়োজনীয় সংস্কারের জন্য রাজনৈতিক দলগুলো ঐকমত্যে পৌঁছানোর পরই জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার বিষয়ে মত দিয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী।
জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সঙ্গে বৈঠকের পর দলটির কেন্দ্রীয় নায়েবে আমির ডা. সৈয়দ আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের এ কথা বলেছেন।
বৈঠকে নির্বাচন নিয়ে জামায়াত কোনো প্রস্তাব দিয়েছে কিনা—জানতে চাইলে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, "আমরা বলেছি, যে সংস্কার প্রয়োজন, সে বিষয়ে সবাই ঐকমত্য হলে যথাশীঘ্র সম্ভব নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। প্রধান উপদেষ্টা বলেছেন, ডিসেম্বরের মধ্যে তারা জাতীয় নির্বাচন করবেন। আমরা দেখছি, কীভাবে সেটা এগিয়ে যায়।"
ভিওএ বাংলা জরিপঃ এক বছরের মধ্যে নির্বাচন চান ৬১.১% মানুষ
অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর কেমন আছে বাংলাদেশ, এ নিয়ে কী ভাবছেন দেশের নাগরিকরা, এ বিষয়ে ২০২৪ সালের অক্টোবরের ১৩ থেকে ২৭ তারিখ, ভয়েস অফ আমেরিকা দেশব্যাপী একটি জরিপ করে।
বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ ৬১ দশমিক ১ শতাংশ মানুষ মনে করেন এক বছরের মধ্যে আগামী জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়া উচিত।
জরিপের ফলাফলে দেখা যায়, ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ লোক চান দুই থেকে তিন বছরের মধ্যে নির্বাচন আর ৮ দশমিক ৬ শতাংশ নির্বাচন চান ১৮ মাসের মধ্যে।
সবচেয়ে কম ৫ দশমিক ৮ শতাংশ জনগণ চার বছর বা তার চেয়ে বেশি সময় পর আগামী জাতীয় নির্বাচন হওয়ার পক্ষে মত দিয়েছেন।
কত দ্রুত নির্বাচন হওয়া উচিত এ ব্যাপারে কিছু জানেন না বলেছেন ৪ দশমিক ৬ শতাংশ মানুষ আর নির্বাচন কবে হওয়া উচিত সম্পর্কে কিছু বলতে চাননি ১ দশমিক ১ শতাংশ।