অ্যাকসেসিবিলিটি লিংক

 
জার্মানি: অভিবাসন, মূল্যস্ফীতি আর ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে অস্থির পরিবেশে গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচন

জার্মানি: অভিবাসন, মূল্যস্ফীতি আর ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে অস্থির পরিবেশে গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচন


জার্মান নির্বাচনী প্রচারণার সময় টেলিভিশন বিতর্কের আগে জরীপে এগিয়ে থাকা দুই দলের প্রধান, ক্রিশ্চিয়ান ডেমোক্র্যাট পার্টির ফ্রিডরিখ মেরটজ (বাঁয়ে) আর অল্টারনেটিভ ফর জার্মানি, বা এএফডির অ্যালিস ভাইডেল। ফটোঃ ১৬ নভেম্বর,২০২৫।
জার্মান নির্বাচনী প্রচারণার সময় টেলিভিশন বিতর্কের আগে জরীপে এগিয়ে থাকা দুই দলের প্রধান, ক্রিশ্চিয়ান ডেমোক্র্যাট পার্টির ফ্রিডরিখ মেরটজ (বাঁয়ে) আর অল্টারনেটিভ ফর জার্মানি, বা এএফডির অ্যালিস ভাইডেল। ফটোঃ ১৬ নভেম্বর,২০২৫।

জার্মানিতে রবিবার (২৩ ফেব্রুয়ারি) যে সাধারণ নির্বাচন হতে যাচ্ছে, তার প্রচারণার কেন্দ্রে ছিল অভিবাসন নিয়ে ভোটারদের ক্ষোভ আর হতাশা।

মধ্য-ডানপন্থী ক্রিশ্চিয়ান ডেমোক্র্যাট পার্টি জনমত জরীপে ২৯ শতাংশ পেয়ে এগিয়ে আছে। জার্মানির পরবর্তী চ্যান্সেলর (প্রধানমন্ত্রী) হওয়ার ক্ষেত্রে দলের নেতা ফ্রিডরিখ মেরটজ-এর সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি।

অভিবাসন-বিরোধী দল অল্টারনেটিভ ফর জার্মানি, বা এএফডি রবিবারের নির্বাচনের জন্য জরীপে ২১ শতাংশ সমর্থন নিয়ে দ্বিতীয় স্থানে আছে। তবে দেশের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো এএফডি’কে সন্দেহভাজন উগ্রপন্থী দল হিসেবে নজরদারির মধ্যে রেখেছে।

“রাজনৈতিক আশ্রয় আর অভিবাসনের মধ্যে যে মৌলিক পার্থক্য আছে, আমি সেই নীতির পক্ষে। রাষ্ট্র এখন পর্যন্ত সেটা করেনি। সবকিছু এলোমেলো অবস্থায় আছে এবং আমাদের দেশে গত দশ বছর ধরে অবৈধ অভিবাসন চলে আসছে,” এএফডি’র যৌথ নেতা অ্যালিস ভাইডেল সোমবার এক টেলিভিশন বিতর্কের সময় বলেন।

সাম্প্রতিক মাসগুলোতে এএফডি’র সমর্থন ধীরে বৃদ্ধি পেয়েছে, বলেছেন বার্লিন সোশাল সায়েন্স সেন্টার-এর ফেলো ভলফগাং শ্রোডার।

“এই দলটি সময়ের সাথে ক্রমশ তাদের সমর্থন বৃদ্ধি করেছে, এবং সেটা হয়েছে তাদের দৃষ্টিভঙ্গি আরও উগ্র হওয়ার সাথে তাল মিলিয়ে,” তিনি দ্য অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসকে বলেন। “তাদের এই সাফল্যের প্রধান চালিকা শক্তি হচ্ছে, এক দিকে তাদের অভিবাসন-বিরোধী নীতি যেটা জার্মানিতে খুবই জনপ্রিয়। তারপর আছে পরিবেশগত পরিবর্তনের বিরুদ্ধে তাদের লড়াই এবং রাশিয়ার যুদ্ধ নিয়ে তাদের অবস্থান।”

ফ্র্যাঙ্কফুর্টের রাস্তায় চ্যান্সেলর ওলাফ শল্টজ-এর সোশাল ডেমোক্র্যাট পার্টির পোস্টার। ফটোঃ ১৯ ফেব্রুয়ারি, ২০২৫।
ফ্র্যাঙ্কফুর্টের রাস্তায় চ্যান্সেলর ওলাফ শল্টজ-এর সোশাল ডেমোক্র্যাট পার্টির পোস্টার। ফটোঃ ১৯ ফেব্রুয়ারি, ২০২৫।

এএফডি ইউক্রেনের জন্য সামরিক সাহায্য পাঠানোর বিরুদ্ধে প্রচারণা চালিয়েছে এবং রাশিয়ার সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের পক্ষে বক্তব্য দিয়েছে।

দলের নীতিমালা যুক্তরাষ্ট্রের ধনকুবের ইলন মাস্ক-এর দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। তিনি গত ডিসেম্বর তাঁর সামাজিক মাধ্যম প্ল্যাটফর্ম এক্স-এ লেখেন, “শুধুমাত্র এএফডি জার্মানিকে বাঁচাতে পারবে।”

জার্মানির ভেল্ট আম যন্টাগ পত্রিকায় এক মতামত প্রবন্ধে মাস্ক লেখেন, “এএফডিকে ডানপন্থী উগ্রবাদী হিসেবে যে চিত্রায়ন করা হয়, তা পরিষ্কারভাবে ভুয়া। দেখুন, দলের নেত্রী অ্যালিস ভাইডেলের একজন সমকামী প্রেমিকা আছে, যিনি শ্রী লঙ্কান। শুনে কি আপনার কাছে হিটলার মনে হলো? প্লিজ!”

মাস্ক এক্স-এ ভাইডেলের সাথে একটি লাইভ আলোচনার সঞ্চালন করেন।

অন্যদিকে, সম্প্রতি জার্মানিতে একের পর এক কয়েকটি সন্ত্রাসী হামলা অভিবাসন নিয়ে বিতর্ক আরও জোরালো করে তুলেছে।

“এবং যেসব কারণে নির্বাচন আসলেই অভিবাসনের দিকে মনযোগী হয়েছে, তার মধ্যে এটি প্রধান এক কারণ,” বলছেন বেলফাস্টের কুইন’স বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক সেরাহ ওয়াগনার।

“এই নির্বাচন ২০২১ সালের নির্বাচনী প্রচারণা থেকে বেশ ভিন্ন। যেমন, তখন অনেক দল জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে অনেক কথা বলছিল,” ওয়াগনার ভিওএ’কে বলেন।

Police stand guard on February 14, 2025 at the scene where a car drove into a crowd in the southern German city of Munich on February 13, 2025 leaving several people injured, police said.
মিউনিখের যেখানে একটি গাড়ি মানুষের ভিড়ে উঠে গেলে কয়েকজন আহত হয়, সেখানে পুলিশ পাহারা দিচ্ছে। ফটোঃ ১৪ ফেব্রুয়ারি, ২০২৫।

জার্মানির কিছু অংশে ক্রমবর্ধমান জনপ্রিয়তা সত্ত্বেও, এএফডি এবং তাদের সমর্থকদের বক্তব্যর কারণে অনেক জার্মান তাদের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়। অতি ডানপন্থীদের বিরুদ্ধে বার্লিন এবং অন্যান্য শহরে বিক্ষোভ হয়েছে।

ইউক্রেন, রাশিয়া আর মূল্যস্ফীতি

অভিবাসন যদিও নির্বাচনী প্রচারণায় প্রাধান্য পাচ্ছে, বিশ্লেষকরা বলেছেন নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্য ভোটারদের বিবেচনার অগ্রভাগে থাকবে। ইউরোপের সবচেয়ে বড় অর্থনীতি জার্মানির মূল্যস্ফীতি সঙ্কট থেকে বের হয়ে আসতে বেশ বেগ পেতে হচ্ছে।

সস্তা রাশিয়ান গ্যাসের উপর অতীতের নির্ভরশীলতা এবং ক্রেমলিনের সাথে ইউরোপের সম্পর্ক দ্রুত ছিন্ন হওয়ার ফলে দ্রব্যমূল্য হুহু করে বেড়েছে। জার্মানির শক্তিশালী গাড়ি নির্মাণকারী কোম্পানিগুলো চীন থেকে কঠিন প্রতিযোগিতার মুখোমুখি। তাছাড়া, যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক আরোপ করার হুমকি নির্বাচনের উপর ঝুলে আছে, যার সাথে আছে প্রতিরক্ষা ব্যয় ব্যাপক হারে বৃদ্ধির জন্য যুক্তরাষ্ট্রের দাবী।

অর্থনৈতিক চাপের কারণে নভেম্বরে তিন-দলীয় জোট সরকারের পতন হয়। সোশাল ডেমোক্র্যাট পার্টির চ্যান্সেলর ওলাফ শল্টজ ২০২৫ সালের বাজেটে ২,৬০০ কোটি ডলারের ঘাটতি পুড়ন করতে এবং ইউক্রেনের জন্য সামরিক সাহায্য অর্থায়নের জন্য আরও বেশি ঋণ নিতে চেয়েছিলেন।

ক্রিশ্চিয়ান ডেমোক্র্যাট পার্টির নেতা ফ্রিডরিখ মেরটজ যুক্তি দেখিয়েছেন যে, দেশের আরও ঋণ নেয়া উচিত হবে না। বরং, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি জোরদার করার চেষ্টা করার উচিত।

“জার্মানির অর্থনীতি এখন ইউরোপিয়ান ইউনিয়নে সর্বশেষ অবস্থানে,” মেরটজ ১১ ফেব্রুয়ারি আইন প্রণেতাদের বলেন।

এএফডি-কে একঘরে

জনমত জরীপে দেখা যাচ্ছে ক্রিশ্চিয়ান ডেমোক্র্যাটরা নির্বাচনে জয়ী হবে কিন্তু সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবে না। এএফডি’র সাথে জোট বাধার সম্ভাবনা মেরটজ নাকচ করে দিয়েছেন, যদিও তারা সম্প্রতি সংসদে অভিবাসন নিয়ন্ত্রণে আরও কঠোর হওয়ার আহ্বান জানিয়ে একটি প্রস্তাব পাস করতে তাদের ভোটের উপর নির্ভর করেছে।

দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর থেকে জার্মানির মূলধারার দলগুলো উগ্র ডানপন্থী দলগুলোর সাথে জোট করতে বাঁ সংসদীয় ভোটে তাদের ভোটের উপর নির্ভর করতে অস্বীকার করে আসছে। উগ্র-ডানপন্থী দলগুলোকে দূরে রাখার এই নীতি “ফায়ারওয়াল” নামে পরিচিত।

যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এই নীতির সমালোচনা করেন। গত শুক্রবার মিউনিখ নিরাপত্তা সম্মেলনে তাঁর ভাষণে ইউরোপীয় মিত্রদের মধ্যে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ থেকে সরে আসার প্রবণতা নিয়ে অভিযোগ তুলে তিনি ডেলিগেটদের অবাক করে দেন।

“যে নীতি গণতন্ত্রের মূল ভিত্তি, তা হচ্ছে যে মানুষের মতামতের মূল্য আছে। এখানে ফায়ারওয়াল-এর কোন স্থান নেই। আপনি হয় এই নীতি সমুন্নত রাখবেন, নয় রাখবেন না,” ভ্যান্স বলেন। পরে তিনি এএফডি’র ভাইডেলের সাথে মিউনিখ শীর্ষ বৈঠকের সাইডলাইনে সাক্ষাৎ করেন।

জার্মানির মূলধারার রাজনৈতিক দলগুলো একজোট হয়ে ভ্যান্সের হস্তক্ষেপ প্রত্যাখ্যান করে।

সোমবার শল্টজ বলেন, “যখন একজন ভাইস প্রেসিডেন্ট জার্মানির নির্বাচনী প্রচারণায় নাক গলান এবং বলেন চরম ডানপন্থী দলগুলো খারাপ না, তখন আমি বলি যে, আমরা চরম ডানপন্থী দলগুলোকে খারাপ মনে করি, এবং আমরা তাদের সাথে কাজ করতে চাই না।”

মেরটজের কণ্ঠে ছিল এই উদ্বেগের প্রতিধ্বনি।

“আমেরিকানরা গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান নিয়ে প্রশ্ন তুলছে। এবং তারা বেশ খোলাখুলিভাবে একটি নির্বাচনে নাক গলাচ্ছে। এবং আমাকে বলতেই হবে, এটা আমাকে বেশ বিরক্ত করছে,” মেরটজ জার্মান সংস্থা ডয়েচে ভেলকে বলেন।

XS
SM
MD
LG